শব্দদূষণ একটি অদৃশ্য আতংকের নাম। প্রতিকার প্রয়োজন।

শব্দদূষণ (Noise Pollution)

শব্দদূষণ একটি অদৃশ্য আতংকের নাম। এটা চোখে দেখা যায়না কিন্তু জল-স্থল-অন্তরীক্ষে সব জায়গায় হতে পারে। শব্দ দূষণকে বিবেচনা করা হয় অনাকাঙ্খিত ও বিরক্তিকর এমন ধরনের শব্দ যা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাস্থ্য ও সুস্থতা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম।

শব্দের মাত্রা (Level of sound)

ডেসিবেল কে শব্দ পরিমাপের একক হিসেবে ধরা হয়। পরিবেশে বিভিন্ন মাত্রার শব্দ পাওয়া যায়। ২০-৩০ ডেসিবেল হতে শুরু করে হেড ফোনে সর্বোচ্চ মাত্রা (৯৪-১১০ ডেসিবেল), রক গানের কনসার্ট (১১০-১২০ ডেসিবেল), প্রকট বজ্রপাত (১২০ ডেসিবেল) ও সাইরেন (১২০-১৪০ ডেসিবেল) পর্যন্ত।  ৮৫ ডেসিবেল এর বেশী শব্দ কানের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

শব্দদূষণ আমাদের কি ক্ষতিসাধন করে (What are the harmful effects of sound pollution)?

শব্দদূষণ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। নিন্মে কিছু ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা হলোঃ

  • শব্দ দূষণের কারণে কানের শুনানি কমে যাওয়া (Noise induced hearing loss – NIHL):

এটা ২ রকম হতে পারে। প্রথম কে বলা হয় অস্থায়ী থ্রেশলদ পরিবর্তন (Temporary threshold shift) যা উচ্চ শব্দের সংস্পর্শে আসলে আমাদের কানের শুনানির মাত্রা কিছু সময়ের জন্য পরিবর্তিত হয়। এটা কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। শব্দ দূষণ প্রতিরোধ করা গেলে পুনরায় পূর্বের জায়গায় সাধারণত ফিরে আসে।

দ্বিতীয়টিকে বলা হয় স্থায়ী থ্রেশলদ পরিবর্তন (Permanent threshold shift)। এটাই সবচেয়ে বেশি মাত্রায় দেখা যায়। উচ্চমাত্রার শব্দ আমাদের অন্তকর্নের শব্দ সংবেদনশীল হিয়ার সেল এবং স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত করে যা একটা পর্যায় পার হলে কোন প্রকার মেডিকেল বা সার্জিক্যাল চিকিৎসার মাধ্যমে ফেরানো যায় না। এটা যেকোনো বয়সের মানুষের মধ্যে দেখা যেতে পারে। এক কানে বা উভয় কানে হতে পারে।

উচ্চ শব্দ হয় এমন পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে বা দীর্ঘদিন কাজ করলে কানের শুনানি আস্তে আস্তে কমতে থাকে যা এক পর্যায়ে স্থায়ী বধিরতায় পরিবর্তিত হতে পারে। আপনি হয়তো শুরুতে এটা বুঝতে পারবেন না বা বুঝতে পারলেও বিভিন্ন কারনে এড়িয়ে যেতে চাইবেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ মানুষের প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বুঝতে পারবেন না। অথবা পরিবারের বা অফিসের মানুষজন বলা শুরু করবেন আপনি হয়তো কম শুনছেন। অনেকের ক্ষেত্রে শব্দদূষণ এর পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত কারনে কানের শুনানি কমে যায় যা সমস্যাটিকে আরও জটিল ও তীব্র করে তুলে। এই অবস্থায় কানের শোনার যন্ত্র হিয়ারিং এইড ছাড়া কোন বিকল্প থাকে না। যেটা একটা মাত্রা পর্যন্ত সাহায্য করবে।

রাস্তায় গাড়ি চলাচল ও অনিয়ন্ত্রিত হর্ন এর ব্যবহার, রেলের ইঞ্জিন, হেলিকপ্টার গান ফায়ার বা বন্দুক থেকে বুলেট নির্গত হওয়ার শব্দ, জেনারেট ও কলকারখানার ভারী যন্ত্রাংশের শব্দ, সেচ ও কৃষি কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর, কাঠ কাটার স’ মিল, রক কনসার্ট, নাইট ক্লাব বা উচ্চ শব্দে ইয়ারফোনে গান শোনা, মাইকের অসতর্ক উচ্চমাত্রার ব্যবহার, নির্মাণ কাজ থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী শব্দের উৎপত্তি হয়। পরিবেশের কোলাহল থেকেও মারাত্মক শব্দদূষণের সৃষ্টি হতে পারে, যা আমাদের কানে শুনানি মারাত্মক ব্যাহত করে।

হটাৎ প্রকট শব্দ যেমন বোমা বিস্ফোরণ, গাড়ির টায়ার বিস্ফোরণ বা যেকোনো তীব্র মাত্রার স্বল্পকালীন শব্দ একবার কানে লাগলেও তৎক্ষণাৎ কান চিরস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে অন্তকর্নের সংবেদনশীল অংশের ক্ষতির পাশাপাশি কানের পর্দা ও কানের অস্থিসন্ধি সমূহ ছিঁড়ে যেতে পারে।

টিনিটাস (Tinnitus) :

কোনো বাহ্যিক শব্দ ছাড়া কানের ভিতর বেজে যাওয়াকে টিনিটাস বলে। ল্যাটিন শব্দ ‘টিনিয়ার’ (Tinnire) থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ ঘন্টার শব্দ। শব্দদূষণ এর কারনে এটা দেখা দিতে পারে। এই রোগে রোগী কানের ভিতর শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ, শিঁষ দেয়ার শব্দ, কেটলিতে পানি বাষ্প হওয়ার শব্দ, হিসহিস শব্দ, রেল গাড়ির ইঞ্জিন এর আওয়াজ, টিভির ঝিরিঝিরি শব্দ ইত্যাদি অনুভূতি হতে পারে। প্রায় ১০-১৫ শতাংশ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ১-২ শতাংশ মানুষ এটার কারণে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করে।

কানে ব্যাথা (Otalgia) :

এটা সাধারণত নিউরোপ্যাথিক অথবা স্নায়ুর প্রদাহের (Sterile Inflammation)  কারনে হয়ে থাকে ধরা হয়। অতিরিক্ত শব্দের কারনে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের কিছু পরিবর্তন দেখা যায় যার কারনে কানে ব্যাথা অনুভব হতে পারে।

হাইপারাকিউসিস বা শব্দের প্রতি অতি সংবেদনশীলতা (Hyperacusis) :

এতে আক্রান্ত রোগীদের একটা বিড়ালের মিউ শব্দকে মনে হয় সিংহের গর্জন, কাগজের পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দকে মনে হয় বজ্রপাত, কমোডের ফ্লাশ এর শব্দ মনে হয় নাইজেরিয়া জলপ্রপাত। এতে আক্রান্ত রোগীরা কত কষ্টে জীবন যাপন করছেন বুঝতেই পারছেন।

মাথা ঘুড়ানো (Dizziness or Vertigo) :

অন্তকর্ণের সাথে যুক্ত ভেস্টিবুলার নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এরকম হতে পারে।

  • এছাড়া অতিরিক্ত শব্দের কারনে উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের অসুখ, ঘুমের সমস্যা, মাথা ব্যাথা ও মানসিক চাপ ইত্যাদি হতে দেখা যায়। এর ফলে কথা বলার সময় ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে। এটা সাধারণত সকল বয়সের মানুষ বিশেষ করে শিশু ও কিশোর দের মধ্যে বেশি প্রভাব ফেলতে দেখা যায়। একটা গবেষণায় দেখা যায় ব্যস্ত রাস্তা বা এয়ারপোর্টের আশেপাশে থাকে এমন বাচ্চাদের মধ্যে স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগ এর অভাব, পড়াশোনার দক্ষতা কমে যাওয়া বেশি পরিলক্ষিত হয়।
  • শব্দদূষণ মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রানী এমনকি পানির নীচের জীব বৈচিত্রের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে থাকে।

শব্দদূষণ প্রতিরোধ (Prevention of sound pollution)

  • বাসা এবং অফিসে প্রয়োজন না হলে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যেমনঃ ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার, টিভি, কম্পিউটার, গেমস ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বন্ধ রাখব। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অর্থও সাশ্রয় হবে।
  • শব্দ হয় এমন যন্ত্রপাতি যেমন জেনারেটর, ডিশ ওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার এর সময় রুমের দরজা বন্ধ রাখব যাতে শব্দ বাইরে আসতে না পারে।
  • শব্দ বেশী হয় এমন যায়গায় যেমন কলকারখানায়, জাহাজের ইঞ্জিন রুম ইত্যাদিতে যারা কাজ করেন তারা কানে ইয়ার মাফ বা ইয়ার প্লাগ ব্যবহার করুন। নির্দিষ্ট কর্মঘন্টার বাইরে কাজ করা যাবে না। নির্দিষ্ট বিরতিতে কানের শুনানি পরীক্ষা করতে হবে। কানের শুনানি কমা শুরু হলে তাকে চাকুরী থেকে বিতাড়িত না করে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ প্রদান ও নিরিবিলি পরিবেশে পুনর্বাসন করতে হবে।
  • গাড়ির হাইড্রলিক হর্ন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও বাস্তবায়নের জন্য আইন প্রয়োগ করতে হবে।
  • হেডফোন বা স্পিকারে গান শোনার সময় ভলিউম কম রাখা ভালো।
  • আবাসিক এলাকা গুলো এয়ারপোর্ট, হাইওয়ে, শিল্প কারখানা থেকে দূরে করা উচিত।
  • যত্রতত্র গান-বাজনা, পার্টি, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক সভা সমাবেশ ও ঘোষণায় অনিয়ন্ত্রিত মাইক ও স্পিকার এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • কিছু সংবেদনশীল জায়গা যেমন- স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, আবাসিক এরিয়ার আশেপাশে সম্পূর্ণভাবে গাড়ীর হর্ন, গান-বাজনা, মাইক বাজানো নিষিদ্ধ করতে হবে।
  • প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগাতে হবে। গাছকে শব্দ শোষনকারী হিসেবে ধরা হয়।
  • যে সমস্ত জায়গায় শব্দ বন্ধ রাখা যায় না যেমন – হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মার্কেট ও অন্যান্য জনসমাগম বেশী হয় এরুপ যায়গায় হালকা মিউজিক ছোট মাত্রায় বাজিয়ে রাখা যায়। এতে কানের ক্ষতি কম হয়। এ সমস্ত যায়গায় শব্দ শোষনকারী ব্যবস্থা স্থাপনের করা যায়।
  • ভারী যন্ত্রাংশ, জেনারেটর, গাড়ি ও কলকারখানার ইঞ্জিন ও যন্ত্রপাতি তে নির্দিষ্ট সময়ে লুব্রিকেন্ট বা তেল ব্যবহার করি এবং নষ্ট যন্ত্রাংশ দ্রুত পরিবর্তন করি। এতে শব্দ উৎপাদন কম হবে।
  • নির্দিষ্ট সময় অন্তর শহরের বিভিন্ন যায়গায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করতে হবে। দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল ও রাতের বেলা ৩০ ডেসিবেল এর ভিতর রাখা প্রয়োজন।
  • সব ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি শব্দ দূষণ প্রতিরোধে সরকার, জনগণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সমাজকর্মী, গবেষক, মিডিয়া সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ডাঃ আলমগীর মোঃ সোয়েব
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), ডিএলও (বিএসএমএমইউ)
নাক কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন

আরো পড়ুনঃ টনসিল ও এডিনয়েড, কখন অপারেশন করাবেন?